| বঙ্গাব্দ

কাতারের রাস লাফান এলএনজি প্ল্যান্টে বিস্ফোরণ, নিহত ১৩ | ২০২৬

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 23-06-2026 ইং
  • 16415 বার পঠিত
কাতারের রাস লাফান এলএনজি প্ল্যান্টে বিস্ফোরণ, নিহত ১৩ | ২০২৬
ছবির ক্যাপশন: কাতারের রাস লাফান

যুদ্ধ পরবর্তী চালুর সময়ই দুর্ঘটনা: রাস লাফান গ্যাস কেন্দ্রে বিস্ফোরণে কাঁপল ৭০ কিমি দূরের দোহাও

বিশেষ প্রতিনিধি: বিডিএস বুলবুল আহমেদ

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬

কাতারের বিশাল ও বিশ্ববিখ্যাত রাস লাফান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কমপ্লেক্সে এক ভয়াবহ ও মর্মান্তিক বিস্ফোরণে অন্তত ১৩ জন শ্রমিক নিহত এবং আরও ৬৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। গত মার্চ মাসে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া প্ল্যান্টের কার্যক্রম পুনরায় চালু করার সময় কর্মরত শ্রমিকরা যখন জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছিলেন, ঠিক তখনই এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।

কাতার প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে একটি ‘কারিগরি দুর্ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা জানিয়েছে, রোববার (২১ জুন) সন্ধ্যায় কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরীণ বারজান স্থানীয় গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্রে এই শক্তিশালী বিস্ফোরণটি ঘটে। বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

নিহতরা সবাই ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিক

সোমবার (২২ জুন) গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবী বিস্ফোরণে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করেন। তিনি অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানান যে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহতদের সবাই মূলত দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিক।

জ্বালানি মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, "এটি কোনো বিদেশি নাশকতা, সাইবার হামলা বা বৈরী কোনো রাষ্ট্রের আক্রমণ নয়; বরং এটি একটি সম্পূর্ণ যান্ত্রিক ও কারিগরি দুর্ঘটনা।" তিনি তথ্য দিয়ে জানান, জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার কাজের জন্য গত ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে এই নির্দিষ্ট প্ল্যান্টটির উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল এবং মাত্র দুদিন আগে এটি পরীক্ষামূলকভাবে পুনরায় চালু করা হয়। কাতার জ্বালানি মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় আশেপাশের পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয়নি এবং প্ল্যান্টের আন্তর্জাতিক রপ্তানি সক্ষমতাও সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রয়েছে। তবে বিস্ফোরণের তীব্রতা ও কম্পন এতটাই বেশি ছিল যে, দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দেশের রাজধানী দোহার কেন্দ্রস্থলেও এটি প্রচণ্ডভাবে অনুভূত হয় এবং গভীর রাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে কাতারএনার্জির উচ্চপর্যায়ের একটি টিম ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে।

তেল-গ্যাস উৎপাদন চালুর নেপথ্য জটিলতা ও থার্মাল শক

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি মূলত সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া শোধনাগারগুলো থেকে পারস্য উপসাগরের বড় বড় জ্বালানি উৎপাদকদের জন্য পুনরায় তেল ও গ্যাস উৎপাদন শুরু করার প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকিগুলোকে বিশ্ব দরবারে নতুন করে ফুটিয়ে তুলেছে। ভূ-রাজনৈতিক কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে কাতার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কারণ দেশটির এলএনজি (LNG) রপ্তানির জন্য সামুদ্রিক কোনো বিকল্প রুট নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘকাল বন্ধ থাকা এলএনজি অপারেশন পুনরায় চালু করা একটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, যেখানে পাইপলাইনের মারাত্মক ‘থার্মাল শক’ বা তাপীয় ধাক্কা এড়াতে অত্যন্ত ধীরগতিতে শীতলীকরণ (Cooling) করতে হয়। গ্যাসকে মাইনাস ১৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠাণ্ডা করে তরলে রূপান্তর করার এই পুরো প্রক্রিয়ায় শীতলীকরণ ধাপটিই প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ।

বারজান গ্যাস কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ও পূর্বের ক্ষয়ক্ষতি

যে বিশেষ প্ল্যান্টটিতে রোববার রাতে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সেই বারজান গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্রটি মূলত কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটির একটি অন্যতম প্রধান অংশ। এটি রাষ্ট্রীয় কাতারএনার্জির একটি বিশাল এলএনজি উৎপাদন ও বিশ্বব্যাপী রপ্তানি কেন্দ্র, যার বার্ষিক সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৭৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বারজান প্ল্যান্টটি মূলত কাতারের অভ্যন্তরীণ শিল্প-কারখানা ও জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করে থাকে এবং রপ্তানির জন্য তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসও (LPG) উৎপাদন করতে পারে।

উল্লেখ্য, এর আগে গত মার্চ মাসে একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাস লাফানের দুটি প্রধান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার ফলে কাতারের মোট এলএনজি রপ্তানি ক্ষমতা সাময়িকভাবে প্রায় ১৭ শতাংশ হ্রাস পায়। কাতারএনার্জির সিইও রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুদ্ধের সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্ল্যান্টের যে কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, তা পুরোপুরি মেরামত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লেগে যেতে পারে। সেই যুদ্ধকালীন সময়ে কোম্পানিটি তাদের অফশোর রিগ এবং অনশোর প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট থেকে প্রায় ১০,০০০ দেশি-বিদেশি কর্মীকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল, তবে সৌভাগ্যবশত মার্চের সেই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

এক নজরে কাতারের রাস লাফান গ্যাস প্ল্যান্টে বিস্ফোরণ (জুন, ২০২৬)

  • দুর্ঘটনাস্থল: বারজান স্থানীয় গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্র, রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি, কাতার।

  • দুর্ঘটনার সময়: রোববার (২১ জুন) সন্ধ্যা বেলা।

  • হতাহতের সংখ্যা: অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৬৬ জন গুরুতর আহত

  • নিহতদের জাতীয়তা: নিহত শ্রমিকদের সবাই ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিক

  • দুর্ঘটনার প্রকৃতি: নাশকতা নয়; বন্ধ প্ল্যান্ট পুনরায় চালুর সময় ঘটা কারিগরি দুর্ঘটনা

  • বিস্ফোরণের তীব্রতা: ৭০ কিলোমিটার দূরে রাজধানী দোহা শহরেও কম্পন অনুভূত

  • পূর্ববর্তী ইতিহাস: গত মার্চে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্ল্যান্টের দুটি ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

কাতারএনার্জির তদন্ত প্রতিবেদন, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজার ও এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতি, নিহত ভারতীয় ও পাকিস্তানি শ্রমিকদের মরদেহ প্রত্যাবর্তন এবং আন্তর্জাতিক খবরের সব এক্সক্লুসিভ ব্রেকিং নিউজের দ্রুত আপদেখের জন্য নিয়মিত ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency